কুরআনের নির্যাসের নামে…


এই জিনিসটা কী জিনিস?

তারিক রমাদানের একটা ভিডিওতেও দেখলাম বলছেন: “কুরআনের ‘এসেন্স’ থেকে বুঝা যায় দীনত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না”। ইয়াসির কাদ্বী সাহেবের লেকচারেও শুনেছি। এনারাও বলছে কুরআন ও ‘সিলেক্টেড’ (পড়ুন ‘মনমতো’) হাদিস থেকে ‘মূল প্রিন্সিপল’ বের করছেন। তার ভিত্তিতে নতুন নতুন মতামত দিচ্ছেন। কুরআনের এই ‘এসেন্স’ বা ‘নির্যাস’ বা ‘মূল প্রিন্সিপল’ বা কুরআনের মেজায বা কুরআনের ‘ইঙ্গিত’। এই জিনিসগুলা আসলে কী? এগুলো কীভাবে বের করা যায়? কারা করতে পারে?

<image1>
<image2>

‘লাকুম দীনুকুম ওয়া লিয়া দীন’।
বাংলা সরলার্থ: তোমার দীন তোমার, আমার দীন আমার।

এই আয়াতের একটা কনটেক্স আছে, একটা উদ্দেশ্য আছে, একটা গ্রামার আছে, একটা বাগবিধি বা অলঙ্কার আছে। সেগুলো সব অস্বীকার করে আপনি দাবি করতে পারেন এই আয়াতের নির্যাস আমি বুঝে ফেলেছি। এখান থেকে ‘মূল প্রিন্সিপল’ আপনি বের করতে পারবেন: যার যার ধর্ম তার তার। সুতরাং কুরআনের উদ্দেশ্য মূলত ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে (সেক্যুলারিজম)। আল্লাহই সব ধর্মের স্রষ্টা। আল্লাহ অনুমোদন দিয়েছেন ‘তোমার ধর্ম তোমার’। সুতরাং সকল ধর্মের সহাবস্থান ও সংমিশ্রণ কুরআনের উদ্দেশ্য (ইন্টারফেইথ)। ইসলামের দাওয়াত ও প্রচার নিষ্প্রয়োজন। ইসলাম ধর্মগ্রহণও জরুরি না। যে যেই ধর্মে জন্মেছে, সেটা ঠিকমতো পালন করলেই আল্লাহ খুশি, আল্লাহ বলেছেনই তো: তোমার ধর্ম তোমার। বরং নিজ বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণই কুফর, আল্লাহর এই আদেশের বিরোধিতা যে: তোমার ধর্মটাই তোমার। সুতরাং সেক্যুলারিজম, রিলিজিয়াস প্লুরালিজমভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রবাদ, ইন্টারফেইথ প্রভৃতি কুরআনের নির্যাস থেকে প্রমাণিত। এবং ধর্মান্তরকরণই কুরআনের নির্যাস বিরোধী ও কুফরী৷ (অতএব, নির্যাস থেকে প্রমাণিত)

তাহলে মনমতো ‘নির্যাস’ বের করে আপনি নানা ধরনের শরবত কুরআনের নামে বানাতে পারলেন। আর যদি আপনি ইসলামী মেথডোলজি অনুসারে আসেন, তাহলে আপনি পাচ্ছেন: আয়াতের শান হল, মক্কার মুশরিকরা নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অফার দিয়েছিল: দেখো, এতো গ্যাঞ্জাম করে লাভ নেই। কিছু সময় আমরা তোমার মা’বুদের ইবাদত করি, আর কিছু সময় তুমি আমাদের মা’বুদের ইবাদত করো। একটা মিউচুয়ালে আসি। আল্লাহ নবিজিকে উত্তর জানালেন: “নবি আপনি বলেন হে কাফেররা, তোমরা যেগুলোর ইবাদত করো, আমি সেগুলোর ইবাদত করি না, করবো না। তোমার দীন তোমার, আমার দীন আমার।” এটা অন্যধর্মের অনুমোদন না যে সেক্যুলারিজম, প্লুরালিজম, ইন্টারফেইথ একোমোডেট হইল। এটা কাফিরদের দীনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ। দুনিয়া উল্টে গেলেও তোমাদের জীবনব্যবস্থা, তোমাদের আরাধ্য আমরা কোনোদিন কবুল করবো না। দেখেন, ‘নির্যাস’ দাবি করে আপনি ঠিক উল্টোটা প্রমাণ করতে পারছেন। কুফরীকে ঈমান আর ঈমানকে কুফরী প্রমান করতে পারছেন।

আন্দাজে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আয়াতের টোন, বাগবিধি, আগের আয়াতের সাথে সম্পর্ক, পরের আয়াতের সাথে সম্পর্ক সবকিছু ডিনাই করে একটা ‘এসেন্স’ বের করে সকল মাসআলায় সেট করে দিলাম। আর বিরাট স্কলার হয়ে গেলাম। এটা হয় হীনম্মন্যতা, নয় উদ্দেশ্য প্রণোদিত অসততা। এভাবে কুরআন থেকে ইচ্ছামতো ‘মূল প্রিন্সিপল’ বা ‘নির্যাস’ বের করে খেলাটা ভণ্ডুল হয়ে যাবে, যদি আপনি ইসলামী মেথডোলজি ফলো করেন। তাহলে কুরআন নিয়ে মনের খুশিতে ঠেলায় ঘোরতে খেলতে আপনাকে এই মেথডোলজি অস্বীকার করতে হবে। মেথডোলজির প্রাণপুরুষদেরকে ‘ক্ল্যাসিকাল’, ‘প্রি-মডার্ন’, ‘পুরুষতান্ত্রিক’, ‘সেক্সিস্ট’ বললে খারিজ করার বৈধতা আপনি পেলেন। ব্যস, আপনি এখন প্রথাবিরোধী স্কলার, ইসলামি জেন্ডার স্টাডিজের পুরোধা।

স্বামী-স্ত্রী আন্তঃসম্পর্কের স্পষ্ট আয়াত যেগুলো আছে…. যেমন কাওয়ামের আয়াত, মাওয়াদ্দাহর আয়াত, বিনা প্রয়োজনে জাহিলিয়াতের মতো বাইরে না ঘুরে ঘরে অবস্থানের আয়াত এগুলো বাদ দিবেন। এরপর খুঁজবেন আপনার আধুনিক পশ্চিমাওয়াশ মগজ কোন আয়াতের নির্যাস পেলে খুশি। সেই দূর-প্রসঙ্গের মানবসৃষ্টির উদ্দেশ্য যে যমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়া (‘খিলাফত’)[অর্থাৎ যে যে দায়িত্বে সেখানে আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা], এটা থেকে আপনি জোর করে নির্যাস বের করবেন: ‘নারীও খিলাফতে সমান অংশীদার। পুরুষ মেথডোলজিস্টরা নারীকে খিলাফতের ভাগ দেয়নি’। এভাবে আপনি স্পষ্ট মুহকাম আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে মুতাশাবিহ অর্থ তৈরি করে সেটাকে নির্যাস বলে দাবি করলেন। এবং নিজের বানানো নির্যাস দিয়ে নবিজির আরও হাদিস, সাহাবীদের ফতোয়া, তাবেঈদের তাফসীর সব ধুয়ে সাফ করে ফেললেন। হয়ে গেলেন নির্যাসবিদ। পারফিউমার। গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গেল সবাই।

২৫০ বছর ধরে আমরা মুসলিমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত। ইসলাম পরাজিত হয় না। আমরা নিজেদের দোষে পরাজিত। পরাজিত যুগে বিজয়ীযুগের মাসআলা রিভাইজ করার চিন্তাকে আমরা সন্দেহ করি। নির্যাসের নামে, উসুলের নামে, মাকাসিদের নামে, মডার্ন ফিকহের নামে যতভাবে পরাজিত মানসিকতাকে শরীয়তের মধ্যে ঢুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, আল্লাহ নিজেই এটা ঠেকাবেন। এসবের নামে কখনও ফেমিনিস্ট থিওরি, কখনও জেন্ডার থিওরি, কখনও ইউটিলিটারিয়ান থিওরি, কখনও হেডোনিস্ট প্রিনসিপল আল্লাহর দীনে ঢুকিয়ে বিজয়ী যুগের মাসআলাকে বদলে দেয়া হচ্ছে। সমস্যা তাও না, সমস্যা হল এজন্য কুরআনের আয়াত অপব্যাখ্যা, লুকোছাপা, হাদিস অস্বীকার ইত্যাদি করা হচ্ছে। কিন্তু যারা চেষ্টা করছে আর যারা হ্যামেলিনের বাঁশিঅলার পিছে ইঁদুরদৌড়ে নেবেছে, তাদের পরিণতি থেকে আমরা সতর্ক করছি। খুব সাবধান।

নতুন কোনো কথা পছন্দ হয়ে গেল মানেই তা সঠিক, তা নয়। নতুন কোনো ব্যাখ্যা শুনে দিলখুশ হয়ে গেল মানেই সেটা নবিজির ইসলাম, সাহাবাদের ইসলাম, তা কিন্তু নয়। ১৪০০ পর এসে কে আপনাকে নতুন করে ওহী বুঝিয়ে দিয়ে গেল। কীভাবে আপনি নবি-সাহাবি-তাবেঈ-তাবেতাবেঈ এভাবে চেইনের এজেন্সিকে ভিলেন বানিয়ে নিজের এজেন্সি দাবি করেন কুরআনের নির্যাস বুঝার? আল্লাহর কালাম আল্লাহর সত্তার অংশ আপনার কাছে এতোই ছেলেখেলা? ভয় করুন তাঁকে যিনি কুরআনের নির্যাস তাঁর নবির অন্তরে ঢেলেছেন, নবি তাঁর সাহাবিদের অন্তরে প্রোথিত করেছেন, উম্মতের শ্রেষ্ঠ অংশ এই ইলমকে ধারণ করেছেন (হাদিস)।

৪ জেনারেশন পশ্চিমা দর্শন দিয়ে ওয়াশ হয়ে লর্ড মেকলের সন্তানরা ‘ইউরোপীয় রুচি’ নিয়ে কুরআনের নতুন ‘নির্যাস’ কচলে বের করছে। আমার হিদায়াত হোক।


Leave a Reply