কালেমার পতাকা ও ব্র্যান্ডিং মনস্তত্ব


মূল বক্তব্যের আগে কয়েকটি টার্মের সাথে পরিচিত হই, চলেন।

১. ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি (Visual Identity)

মার্কেটিংয়ের ভাষায়, একটি ব্র্যান্ডের লোগো, ফন্ট (Typography), কালার প্যালেট এবং ইমেজ ব্যবহারের সামগ্রিক রূপকে “ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি” বলে। এটি ব্র্যান্ডের একটি অদৃশ্য চেহারা, যা দেখে কাস্টমাররা এক সেকেন্ডেই ব্র্যান্ডটিকে চিনে ফেলে। [1]

২. ট্রেড ড্রেস (Trade Dress)

এটি একটি আইনী এবং মার্কেটিং টার্ম। কোনো পণ্যের বাহ্যিক রূপ, আকার, ফন্ট, কালার কম্বিনেশন এবং প্যাকেজিংয়ের অনন্য নকশাকে একত্রে “ট্রেড ড্রেস” বলা হয়। যেমন— কোকা-কোলার লাল রঙ এবং তাদের বিশেষ বাঁকা ফন্টের লেখাটি তাদের ট্রেড ড্রেসের অংশ।

৩. টাইপোগ্রাফিক ব্র্যান্ডিং (Typographic Branding)

যখন কোনো ব্র্যান্ড লোগোতে আলাদা কোনো ছবি বা প্রতীক ব্যবহার না করে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ফন্ট বা লেখার স্টাইল দিয়েই নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করে, তখন তাকে টাইপোগ্রাফিক ব্র্যান্ডিং বা “ওয়ার্ডমার্ক” (Wordmark) লোগো বলা হয়। (যেমন: Google, Sony, বা Coca-Cola)।

এই বিশেষ কালারিং ও ফন্ট (যাকে বলা হয় ওয়ার্ডমার্ক), এটা কিন্তু আর নিছক বেওয়ারিশ কিছু একটা নেই। এটা ঐ কোম্পানি, তাদের পলিসি-নীতি-আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, খ্যাতি-কুখ্যাতির প্রেজেন্টেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  আপনি চাইলেই ‘এই শব্দটা এই ফন্টে’ ভিন্ন কোন অর্থে ব্যবহার করতে পারবেন না।

যেমন: ধরা যাক, আপনি আপনার ছেলের নাম রাখলেন স্যামসাঙ। এবার আপনি একটা মোবাইলের দোকান দিলেন ছেলের নামে ‘স্যামসাঙ ইলেকট্রনিক্স’। তবে স্যামসাঙ মোবাইল আপনি রাখেন না, চায়না বাটন-ফোন রাখেন। সেই দোকানের সাইনবোর্ডে আপনি এই হুবহু ফন্টে দোকানের ব্র্যান্ডিং করলেন। এখন তিনটা ঘটনা ঘটবে:

১. স্যামসাঙ কোম্পানির নজরে পড়লে, তারা মামলা করতে পারবে। এবং আদালত আপনাকে বাধ্যতামূলক ডিজাইন চেঞ্জ করাবে। ছেলের নামে দোকানের নাম রেখেছেন, এই অজুহাতে আপনি ‘এই শব্দ এই ফন্টে’ ব্যবহার করতে পারবেন না। আবার পড়ুন ‘একই শব্দ একই ফন্টে’। এজন্য আপনারা দেখবেন NOKIA-র ওয়ার্ডমার্ক NOKLA নামে ফন্ট একই রেখে ব্যবহার করতে। ভিন্ন শব্দ একই ফন্টে ব্যবহার করা হয় ক্রেতার মাথায় মূল ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক ক্যাশ করার জন্য।

এজন্য দেখবেন মূল ওয়ার্ডমার্কের নিচে কখনও কখনও গোলের ভেতর TM (trademark) বা © (copyright)বা ® (registered) লেখা থাকে। এটা মানে হল ‘ঐ ফন্টে ঐ নামের’ আইনী সুরক্ষা।

২. কাস্টমার আপনার দোকানে এসে স্যামসাঙ কোম্পানির মোবাইল খুঁজবে। পাবলিকের মাথায় ‘এই শব্দ এই ফন্টে’ ঐ কোম্পানির জন্যই খাস হয়ে গেছে। ‘আরে এটা ফোনের কোম্পানি না, আমার ছেলের নামে নাম’ বলে পার পাবেন না। জনে জনে আপনার বুঝাতে হবে, ভাই এটা আমার ছেলের নাম, আমি স্যামসাঙের মোবাইল বেচি না।

৩. আপনি যদি হুবহু এই শব্দ এই ফন্টেই ব্যবহার করতে চান, মূল কোম্পানি থেকে আপনাকে ফ্রাঞ্চাইজ কিনতে হবে। মানে হল: এই ওয়ার্ডমার্কের দ্বারা কোম্পানির খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতাকে আপনি ব্যবহার করছেন, তা দিয়ে কাস্টমার ধরছেন।  তাই লাভের একটা অংশ মূল কোম্পানিকে দিলে সে আপনাকে এই ওয়ার্ডমার্ক বা লোগো ব্যবহারের অনুমতি দেবে  কোয়ালিটি মেইনটেইন করে। মানে এই শব্দ এই ফন্টে ব্যবহার করে আপনি মূল কোম্পানির খ্যাতি বা কুখ্যাতি শেয়ার করছেন। খ্যাতি/কুখ্যাতির অংশীদার হচ্ছেন। এটা আর নিছক আপনার ছেলের নাম নেই। ‘ছেলের নামে দোকানের নাম রাখার অধিকার’ কেন নেই, এই হাহাকার বিলাপে কাজ হবে না।

এবার আসুন কালেমার পতাকার আলাপে। পতাকা স্রেফ একটা কাপড়ের টুকরা না। পতাকা, ফ্ল্যাগ, ব্যানার, নিশান যে নামেই ডাকেন না কেন এর অর্থ হল এটা আপনার ট্রেডমার্ক। এটা আপনার প্রতিনিধিত্ব করে। আপনার সংগঠন, আপনার আদর্শ-নীতি-পন্থার উপস্থাপন। এটা দেখলেই মানুষের মাথায় ক্লিক করে অনেকগুলো কথা: এরা কারা, এরা কী চায়, এরা কী করে ইত্যাদি। আপনি যদি আলাদা কিছু হন, আপনার উপস্থাপনও হবে আলাদা। আর আপনি যদি কোন সংগঠনের এফিলিয়েশনে বা ফ্র্যাঞ্চাইজে থাকেন, কারও ব্রাঞ্চ হয়ে থাকেন, তাহলে মাদার সংগঠনের পরিচয় বা প্রেজেন্টেশন ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে মাদার সংগঠনের দায় ও সুনাম দুটোরই অংশীদার হবেন।

কালেমার পতাকাগুলো কোনো সংগঠনের রেজিস্টার করা আইনী সুরক্ষাপ্রাপ্ত কিছু নয়, ঠিক আছে। কিন্তু জনতার ব্রেইনের নিউরনে, মস্তিষ্কের কোষে তো রেজিস্টার করা। ঠিক যেমন কোকাকোলা ঐ শব্দে ঐ ফন্টে আমাদের মাথায় ট্যাগ করা। দেখেন এই যে সমকামীরা রঙধনু ব্যবহার করে সব জায়গায়, বাচ্চাদের খেলনা পর্যন্ত। কেন? যাতে মানুষের মাথায় এই চিহ্নটা রেজিস্টার হয়ে যায়, এই কালারটা যত নর্মালাইজ করা যাবে, সমকামিতার প্রতিও সমাজ তত সহনশীল হয়ে উঠবে। সুতরাং ব্রেইন এভাবেই ফাংশন করে। কোনো কিছুকে কোনো কিছুর সাথে ট্যাগ করে, মিলিয়ে বোঝে। একে বলে কন্ডিশনিং। কালারের সাথে, ফন্টের সাথে, লোগোর সাথে কোনো আইডিয়াকে বা দর্শনকে ট্যাগ করা।

কালেমার পতাকাগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন।

এটা ব্যবহার করে চেইন তাকফিরি আইএস/দায়েশ/দাওলাহ। অধিকাংশ আলিমের মতে এরা নব্য-খারেজি।
এটা ব্যবহার করে বৈশ্বিক জিহাদী সংগঠন আল-কায়েদা
এটা ব্যবহার করে আফগানের বর্তমান সরকার তালেবান। এটা এখন ইসলামী ইমারত আফগানিস্তানের অফিসিয়াল পতাকা।
এটা ব্যবহার করে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী জিহাদী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান
এটা ব্যবহার করে হামাসের আল-কাসসাম ব্রিগেড
এটা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় পতাকা। সৌদ পরিবার বহু আগে থেকেই কালেমার পতাকা ব্যবহার করত। ১৯২১ সালে বাদশাহ আবদুল আজিজ তরবারিটা যুক্ত করেন
বৈশ্বিক খিলাফতকামী দাওয়াতী সংগঠন হিজবুত তাহরীর এই দুটো পতাকাই ব্যবহার করে।

দেখুন প্রতিটি পতাকাই কোন না কোন পরিচয়কে ধারণ করছে। কোনো দলের আদর্শ, কর্মপন্থা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে ধারণ করছে। এর কোনটাই জাস্ট কালেমার পতাকা আর নেই। মানুষের মগজে এই কালেমার বাক্যটা, এই স্পেসিফিক ফন্ট ও কালারে একটা কন্ডিশনিং/রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছে।

ঠিক ছেলের নাম স্যামসাঙের মতো। সৌদির পতাকা আপনি জাস্ট কালেমার পতাকা হিসেবে লাগাতে পারবেন না। লোকে এসে জিগ্যেস করতে পারে নতুন ভিসা অফিস খুললো কিনা সৌদি কর্তৃপক্ষ। তালেবান, একিউ বা টিটিপির পতাকা লাগালে ঐ স্যামসাঙ দোকানের মত জনে জনে কৈফিয়ত দিতে হবে, ভাই আমি ওনাদের মতাদর্শী না। এটা হবেই। আপনাকে বুঝতে হবে এটা আর স্রেফ কালেমার পতাকা নেই। এরা এখন একটা আদর্শ, কিছু একটার স্বতন্ত্র পরিচয় যাদের কর্মপন্থার সাথে হয়ত আপনি পুরোপুরি একমত না, তাদের ফ্রাঞ্চাইজ বা শাখাও নন। তাহলে কেন আপনি এই ওয়ার্ডমার্ক ধারণ করবেন? জাস্ট কালিমার পতাকা হিসেবে ধারণ করলেও অটোমেটিক ঐ সংগঠনের সুনাম বা বদনামের ভাগীদার আপনাকে হতে হবে। আমার এই কথাকে সুশীলতা বললেই কথা মিথ্যে হয়ে যাবে না। মানুষের মগজ এভাবেই কাজ করে কন্ডিশনিং এর মাধ্যমে।

কালিমার পতাকা নর্মালাইজেশন এর একটা প্রভাব সমাজে আছে। যেমন ইসলামের শিআর/প্রতীকগুলো সমাজের চোখে চোখে থাকার একটা ডীপ সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট আছে। যোমন মসজিদগুলো মিনারসহ তৈরি করা। তবে তা হতে হবে কালিমার ব্র্যান্ডিং, কোনো সংগঠনের ব্র্যান্ডিং না। আবার বলছি, সংগঠনের ব্র্যান্ডিং হয়ে গেলে সংগঠনের দায়ও বর্তাবে। সেটা নিতে প্রস্তুত আছেন কিনা। যদি না থাকেন, তাহলে সংগঠনের ব্র্যান্ডিং না হবার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

আবার কালেমার পতাকার ক্ষেত্রে সাদা ও কালোর একটা সুন্নাহগত ভিত্তিও আছে। নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধকালে কালেমাখচিত কালো পতাকা (রায়া) ও সাধারণ অবস্থায় কালেমাখচিত সাদা পতাকা (লিওয়া) ব্যবহার করতেন। সেক্ষেত্রে আপনি ফন্ট পরিবর্তন করতে পারেন। হয় রঙ, না হয় ফন্ট পরিবর্তন করলেই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন। এরপর সারাদেশ কালেমার পতাকা দিয়ে ভরে ফেললেও সমস্যা নেই। যদি কালেমার পতাকা নরমালাইজেশনই উদ্দেশ্য হয়। আর সাথে সংগঠনের ব্র্যান্ডিং চাইলে ভিন্নকথা।

সাদা বা কলোর উপর এরকম ফন্টের ব্যবহার
সাদার উপর গাঢ় নীল বা গাঢ় সবুজ রঙ
কালোর মাঝে সোনালী বা রূপালি রঙ ভাল ফোটে

এগুলো কেন কালিমার পতাকা নয়? অবশ্যই এগুলোও কালেমার পতাকা। এগুলোর নরমালাইজেশনেও আমাদের একই লক্ষ্য অর্জিত হবে।

আর বাংলাদেশের ইতিহাস, মানুষ ও সমাজের বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘ উপনিবেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ভৌগোলিক অবস্থান ও বাস্তবতা সবকিছুই যেকোন আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সংগঠনের কৌশলের জন্য উপযুক্ত নয়। আফগানে যেভাবে হয়েছে, এখানে হুবহু সেভাবে হবে না। কপি-পেস্ট না করে এখানকার জনগণের বাস্তবতা স্টাডি করে কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে। আর তা অবশ্যই তাওহীদ ও সুন্নাহকে বাদ দিয়ে, কেটেছেঁটে মডারেট বানিয়ে নয়।

ভিন্ন ইতিহাস ও বাস্তবতার কোনো সংগঠনের ফ্র্যাঞ্চাইজি এখানে কাজ করবে না ও আত্মবিধ্বংসী হবে। সে আলাপ এখানে টানছি না। অন্য কোথায়ও আমি কী মনে করি, তা সবিস্তারে লিখব। আমাদের বুঝতে হবে, কালিমার পতাকায় মুনাফেক ছাড়া কারও সমস্যা না, সমস্যা হল ব্র্যান্ডিং-এ। যে ব্র্যান্ডিং-টা হয়ে যাচ্ছে, সেটাও আমরা চাচ্ছি কিনা, সেটা আমাদের দাওয়াহকে এগোচ্ছে নাকি পিছাচ্ছে। এটা আমার উদ্বেগের জায়গা। এতদিন বলা হয়নি, নিফাকগ্রস্তদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হবে বলে। আজ লিখলাম যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যবহার করে আল্লাহ তাদের কূটচালকে বানচাল করে দিয়েছেন, তাই।

কালেমার নরমালাইজেশনের আসল ধাপ তো কালেমার দাওয়াহ। নবিজি যেটা করেছেন, এটাতে অনীহা জেঁকে বসেছে কেন? আশা করি কালেমার পতাকার জন্য যেভাবে সারাদেশে কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে, কালেমার দাওয়াতের ক্ষেত্রেও সেটা অব্যাহত থাকবে।