মে, ২০১৬ তে আমেরিকার National Institute of Justice আরও বিজ্ঞানভিত্তিক দণ্ডবিধি প্রণয়নের জন্য বিখ্যাত অপরাধবিদ Daniel S. Nagin-এর একটি গবেষণাকে (Nagin, 2013) কেন্দ্র করে তাদের সাইটে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করে। মূল গবেষণাকে বিশ্লেষণ করে সেখানে ৫টি দফা উল্লেখ করা হয়। সবগুলো আলোচনার সুযোগ নেই। ৫ নং দফাটি ছিল: মৃত্যুদণ্ড যে অপরাধকে কমায়, এমন কোনো প্রমাণ নেই (There is no proof that the death penalty deters criminals)।
আজকের লিবটার্ডরা মৃত্যুদণ্ডকে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘন হিসেবে দেখে। এজন্য এই মত নিয়ে খুব প্রপাগাণ্ডা চালায়। অথচ মৃত্যুদণ্ড কেবলই একটা দণ্ড নয়, এটা একটা সোশ্যাল কন্ডিশনিং। মৃত্যুদণ্ড অপরাধ কমায় না, এটা লিবারেলরা যেভাবে বেদবাক্য হিসেবে প্রচার করছে, আসলে বিষয়টা এত সহজে বলে দেওয়া যায় না। অপরাধবিদদের মধ্যে এই টপিকে ইখতিলাফ (মতবিরোধ) আছে। পক্ষ-বিপক্ষ আছে। উভয় পক্ষে পরিসংখ্যান-গবেষণা আছে। Does the Death Penalty Deter Crime?—এই তুলনামূলক আর্টিকেলে কিছুটা আভাস পাবেন।
যারা মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে তারা ‘শর্ট টার্ম’ ফলাফল চাচ্ছেন, কিছুটা গাছ লাগিয়েই ফল খেতে চাচ্ছেন। আজকে আমি আমগাছ লাগালাম, কৈ এইবছর আম তো খেতে পারলাম না? আম তো এ বছর ধরল না? অথচ গাছ লাগিয়েছেই এই বছর। X বছরে এতগুলো মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তারপরও ওই একই X বছরে এতগুলো খুন হয়েছে, তার মানে আসলে মৃত্যুদণ্ডের কোনো প্রভাব নেই।
a) Stanford University-র আইনের প্রফেসর John J. Donohue, JD, PhD বলছেন, গত বছর ১৪০০০ খুন হয়েছে, ৩৫টা মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, কমলো না তো। অতএব, মৃত্যুদণ্ড অপরাধ কমায় না। আরে ভাই, একই বছরে কীভাবে কমবে? সুইচ নাকি? ২-৫ বছর পরে প্রভাব পড়বে, সাথে সাথে হয় নাকি?
b) প্রফেসর Michael L. Radelet, PhD আবার প্রমাণ এনেছেন, টপ অপরাধবিদদের মধ্যে মতামত নিয়ে দেখা গেছে ৮৮.২% ভোট দিয়েছে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে, আর ৯.২% বলছেন এর পক্ষে। তার মানে বিজ্ঞান কি পরিসংখ্যান দিয়ে কথা বলবে, নাকি ভোটাভুটি দিয়ে? ভোটাভুটির বিজ্ঞান? যেখানে ৫৬% বিজ্ঞানীই লিজেকে লিবারেল ডেমোক্রেট দাবি করে। লিবারেলিজমের প্রভাব তো তাদের মতামতে পড়বেই।
আর মৃত্যুদণ্ডের পক্ষের বিজ্ঞানীদের একজন Pepperdine University-র প্রফেসর Michael Summers, PhD বলেছেন, আমরা গবেষণায় দেখেছি প্রতিটা মৃত্যুদণ্ড ‘পরের বছরে’ ৭৪টি করে খুন কমার সাথে সম্পর্কিত। ১৯৭৯-২০০৪ এই ২৬ বছরের ডাটা FBI source থেকে নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যখন মৃত্যুদণ্ড বেড়েছে, খুন কমেছে; আবার যখন মৃত্যুদণ্ড কমেছে, খুন বেড়েছে। উনি দেখিয়েছেন, ৮০’র দশকের শুরুতে যখন আমেরিকার দণ্ডবিধিতে মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনা হলো, তখন খুনের সংখ্যা কমে গেছে। আবার ৮০’র দশকের মাঝ থেকে শেষ পর্যন্ত যখন প্রতিবছর মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ২০ এ থেমে ছিল, তখন খুনের সংখ্যা বেড়েছে। পুরো ৯০’র দশক জুড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা বেড়েছে, এবং খুনের সংখ্যা হঠাৎ করে পড়ে গেছে (plummeted)। ২০০১ থেকে আবার মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা কমেছে, খুনের সংখ্যা বেড়েছে। মানে বছরেরটা বছরের ঘাড়ে না চাপিয়ে, ৫-১০ বছরের হিসেব সামনে নিয়ে দেখা গেছে মৃত্যুদণ্ড পরের বছরগুলোতে খুনের সংখ্যা কমিয়েছে।
আপনাদের কাছে কী মনে হচ্ছে জানি না, আমার কাছে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানটাই বেশি যৌক্তিক মনে হচ্ছে। কেননা, মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ, সোশ্যাল কণ্ডিশনিং তো চট করে হবে না, দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান সামনে নিয়েই দেখতে হবে কমলো কি না।
খ্যাতিমান অপরাধবিদ Ronald L. Akers বলেন, সমাজ মানস গড়ে ওঠে শাস্তি বা পুরস্কারের মাধ্যমে আচরণ শেখানোর দ্বারা (Instrumental বা Operant Conditioning)। এজন্য তিনি social learning theory প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, social learning theory মতে পুরো আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় এই বিষয়গুলো দিয়ে।
– শাস্তির ভয় (negative punishment)
– পুরস্কার হারানোর ভয় (negative reinforcement)
– শাস্তি থেকে বাঁচা (positive punishment)
– পুরস্কার পেয়ে যাওয়া (positive reinforcement)
কুরআন এটাই আমাদের জানিয়েছে ১৪০০ বছর আগে। নিশ্চয়ই আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ আমাদের থেকে গাফিল নন, উদাসীন নন। অপরাধবিজ্ঞানের মূলনীতিও বলে দিয়েছেন দুনিয়ার জীবনকে সুখময় করার জন্য:
‘হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের ওপর ‘কিসাস’ ফরয করা হয়েছে। … আর হে বিবেকসম্পন্নগণ, কিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন, আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে।’ [সূরা বাকারা, ২ : ১৭৮-১৭৯]
অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হলে, এর মধ্যেই আছে আরও জীবন রক্ষা, রয়েছে অপরাধ হ্রাস পাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদেরকে লিবটার্ড বানাননি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন।
রেফারেন্সগুলো সহ বিস্তারিত জানতে:
বই: মানসাঙ্ক
সন্দীপন প্রকাশনী
