জোর যার মুল্লুক তার


কথাটা নেগেটিভ অর্থে ব্যবহৃত হলেও সর্বৈব সত্য। তৌহিদের কলেমার পর এর চেয়ে সত্য আর কোনো কথা দুনিয়ার বুকে খুব বেশি নাই।

পেশীশক্তির বিকল্প হিসেবে সভ্য সমাজে ‘বৈঠক’ বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান (নেগো) বহুল চর্চিত। আদিম টাইপ সমাজের জন্য পেশীশক্তি, আর সভ্য শাদা ও শাদাটে সমাজের জন্য নেগো- এমন একটা ন্যারেটিভ বানায়ে রাখা হইসে। অথচ একটু গওর করলেই এই কথাটা যে কতবড়
ডাহা মিথ্যে তা বুঝা যায়। নেগোর টেবিলে সেই জেতে যার পেশীশক্তি আছে। যার নাই, সে জেতে না। তাকে মায়া করে সামান্য দেয়া হয়, যা ইনসাফ না, যা তার অধিকারের ন্যূনতমও না, সান্ত্বনাও না। দুর্বলের জন্য সান্ত্বনাও নাই! কল্পনা করসেন!

তার মানে এই নেগোর ডাক আসলে দুর্বলকে একটা চক্রে ঢুকিয়ে দেয়া। যাতে সে সভ্য হবার তাড়নায় পেশীশক্তিকে ঘৃণা করে > পেশীশক্তি অর্জনের চেষ্টা বাদ দেয় > নেগোর টেবিলেও দুর্বলই থাকে > জুলুমের ইনসাফ আর কোনোদিন না পায়। আর সবল যে, সে তার পেশীশক্তির জোরেই নেগোর শর্ত অগ্রাহ্য করতেই থাকে, করতেই থাকে। পেশীশক্তিকে খাটো করতে শেখায় ঐ সবল, যাতে সভ্য হওয়ার তাগিদে দুর্বল পেশীশক্তির জরুরতকে অগ্রাহ্য করে। চিরটাকাল দুর্বলই থাকে।

ইনসাফ একটা কালচার। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, আন্তর্জাতিকভাবে একটা সাম্যাবস্থা। যা নির্ধারণ করে এই ‘জোর’। ইনসাফের ভিত্তি কোন সোকল্ড জ্ঞান না, সভ্যতা না, মতবাদ না। ইনসাফের ভিত্তি একমাত্র জোর, শক্তি এবং পেশীশক্তি। পেশীশক্তির উপরই নির্ভর করে অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি, হাবিজাবি শক্তি। এটা আদিম যুগেও সত্য, শাদা সভ্যতার যুগেও সমান সত্য।

সোকল্ড পশ্চিমা সভ্যতা ইনসাফকে কালচারের জায়গা থেকে ব্যক্তিগত মহানুভবতার পর্যায়ে নামিয়েছে। অথচ মানুষের স্বভাব হল: অধিকাংশ মানুষ ডিটারেন্স (বাধা) না থাকলে সুযোগসন্ধানী। সুযোগ দেয়া হলে সে শিশ্ন-উদর এবং এদের বাপ নফসপূর্তি করার জন্য সবকিছু করবে (মগজে লিম্বিক সিস্টেম)। অধিকাংশ মানুষ অধিকাংশ সময় মহানুভব হতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজন, তা পূর্তি এবং ডোপামিন ছাড়া কিছু বোঝে না। সুতরাং সমাজে অর্গানিক ইনসাফের জন্য প্রচুর শিক্ষা, প্রচুর মোটিভেশন, প্রচুর নৈতিকতা শর্ত না। এই পাওয়ার ব্যালেন্স শর্ত। আশা করি লেখা শেষে আরও স্পষ্ট হবে।

জাহেলিয়াত ছিল অবিমিশ্র প্রবৃত্তির যুগ। একেবারে আনইন্টেরাপ্টেড। ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি বাধা পেত গোত্র প্রবৃত্তির কাছে। অবাধ প্রবৃত্তি তৈরি করে জুলুম। হয় ব্যক্তিক জুলুম, নইলে গোত্রীয় জুলুম।

গোত্র হল সর্বোচ্চ সত্তা, এখন যেমন রাষ্ট্র। গোত্রস্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ বাদ দিতে হবে। গোত্রে গোত্রে পাওয়ার ব্যালেন্স থাকবে। ডিটারেন্স থাকবে। অনেকটা দুইটা সমবলের টানে রশি স্থির থাকার মতো।

ব্যক্তিস্বার্থ দুর্বল ব্যক্তির উপর জুলুম তৈরি করে। গোত্রস্বার্থ দুর্বল গোত্রের উপর। রশির টান একদিকে দুর্বল হলে সবল তাকে হেঁচড়ে নিজের দিকে নিয়ে আসে। সবল সবলের উপর জুলুম করবে না। ইনসাফ বজায় থাকার শর্ত হল গায়ের জোর। গায়ের জোর নাই, আপনার জন্য ইনসাফ না।

পরিবারেও তাই। স্ত্রীর উপর জুলুম করলে বউয়ের পুরো গুষ্টি এসে ‘কীরে, আমাদের মেয়ের উপর জুলুম? কিসাস দে, বদলা দে’ এইরকম টাইপ। এক সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তো শ্বশুর গুষ্টি এসে নিজেদের মেয়ে নিয়ে চলে গেছে টেনে।

এসব ঝামেলা এড়াতে সব জায়গায় একটা ডিটারেন্স, একটা ইনসাফের আবহাওয়া থাকবে। এই আপাত ইনসাফমূলক মূলনীতিগুলোকে ইতিহাসে বলে ‘মুরুওয়াত’। মরুর বেইসিক ইনস্টিংক্ট, পাওয়ার ব্যালেন্স, ইবরাহীমী ইসমাঈলী শরীয়তের অপভ্রংশ মিলেঝিলে এই মুরুওয়াত। সমস্যা হল: দুর্বলের উপর জুলুমটা এই অর্গানিক ইনসাফ ঠেকাতে পারে না। [ক]

এবার এলো ইসলাম। নতুন সংগঠন ‘ইমারত’, গোত্রের চেয়ে বড় আনুগত্যের দাবি নিয়ে। আগে গোত্র কারও আনুগত্য করতো না। গোত্র ছিল সভরেন। এখন গোত্রকেও আনুগত্য করতে হবে ইমারতের। ইমারতে মদীনা। কারণ কি? কারণ ইমারত আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করে। গোত্রের চেয়েও সভরেন আল্লাহ। ইমারতের আনুগত্য মানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আনুগত্য। ব্যস।

আগের মুরুওয়াত কিছু কিছু ‘উরফ’ হিসেবে থাকল (কারণ এটা ফিতরাত থেকে উৎসারিত ছিল), কিছু ‘জাহেলিয়াত’ হিসেবে বাদ গেল, কিছু নিয়ন্ত্রিত/মডিফাই হলো। কিছু নতুন মূলনীতি বলে দেয়া হলো। এভাবে আল্লাহ শরীয়তকে গঠন করলেন।

ইমারত হল শরীয়ত এক্সিকিউটর।
যদি শরীয়ত না মানো, তবে ইমারত যুদ্ধ করে মানাবে। গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যদি গরীবের হক যাকাত না দাও, যদি দুর্বল ব্যক্তির উপর জুলুম করো (ডাকাতি, যিনা বিল জবর, হত্যা, জখম, চুরি), দুর্বল অংশের উপর জুলুম করো (নারী, শ্রমিক, গরীব) তবে দুর্বলকে প্রতিশোধ/শোধ তুলতে সাহায্য করবে ইমারত, তার বিচার ব্যবস্থা দ্বারা।

এভাবে মুরুওয়াতের কমতিগুলো পূর্ণ করলো শরীয়ত, তার ঐশী সংস্কারের মাধ্যমে। ইসলামী ইমারতে সবাই সবল। এখন আগের অর্গানিক ইনসাফের সাথে আরোপিত ইনসাফ যুক্ত হল। পূর্ণাঙ্গ ইনসাফ তৈরি হল, যেখানে ইনসাফ শুধু জোরের উপর নির্ভর করে না। ইনসাফ অটো। সবলও ডিটারেন্স ফিল করছে এখন। জুলুম করলে করতে পারি, কিন্তু সার্বভৌম শরীয়ত তো আমাকে ছাড়বে না। ইনসাফের পরিবেশ। ইনসাফের আবহাওয়া।

এখন প্রশ্ন আসবে, শরীয়ত ধ্রুবক, না হয় বুঝলাম। কিন্তু শরীয়ত নির্বাহ করবে যে, প্রয়োগকারী তো ভ্যারিয়েবল। সর্ষের ভিতর যে ভূত নাই, তা নিশ্চিত করবে কে? এইজন্যই ইসলাম হল দীন, পরিপূর্ণ সিস্টেম/মিনহাজ।

ইসলামের আধ্যাত্মিক অংশটা শক্তিশালী করে পার্থিব অংশটাকে। তার বিচারব্যবস্থা তথা শরীয়তের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে সে ব্যবহার করতে পারে মানুষের হৃদয়ের গহীন দায়বদ্ধতাকে। যে আবেগ নিয়ে ঐ মদখোর নবী অবমাননার প্রতিবাদ মিছিলে আসে,
যে দায় নিয়ে ২ জুমআ পর হলেও ৩য় জুমআয় হাজিরি দিয়ে যায়,
যে আবেগের কারণে ঐ পতিতা মেয়েটাও আজান পড়লে মাথায় কাপড় দেয়,
যে দায়ে সবচে পশু লোকটাও হজ করে এসে সব ছেড়ে ভালো হয়ে যাবার নিয়ত করে।
ইসলাম ঐ জায়গাটাকে ব্যবহার করে তার রাষ্ট্র, তার বিচার, তার বাজার, তার ব্যবসায়, তার যুদ্ধ বাস্তবায়নে। যেটাকে আমরা জাতে উঠতে ট্রল করি: মুমিনের অন্ধত্ব, মুমিনের গোঁড়ামি, মুমিনের আবেগিতা। এই নিখাদ ডেডিকেশন ব্যবহার করার ক্ষমতা কেবল ধর্মের আছে। অনেকে ধর্মের পবিত্রতা কেড়ে নিয়ে ধর্ম হয়ে ওঠার চেষ্টা করসে (জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, চেতনা), কিন্তু সফল হয়নি। সুতরাং শরীয়ত লক্ষ্য অর্জন করছে কিনা দেখেন, এক্সিকিউশন নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে।

সুতরাং ইসলাম ইনসাফের আবহাওয়া তৈরি করে। জুলুমের ডিটারেন্স তৈরি করে। অপরাধ কমে আসে। ভালো মানুষ ভালো থাকে। খারাপ লোকের জীবন দোজখ হয়ে যায়। [খ]

এবার ইমারত বাদ দিয়ে এলো গণতন্ত্র…
[চলবে ইনশাআল্লাহ ]